Reading Time: 4 minutes

স্কুল বলতে একসময় চোখে ভেসে উঠতো একতলা এল শেপের ভবন, ওপরে টিনের ছাদ। ইদাইং শহুরে বাচ্চারা স্কুল বলতে বোঝে উঁচু দালানের এয়ার কন্ডিশন্ড ক্লাসরুম। তবে কিছু স্কুলে এখনো আছে খোলা মাঠের হাতছানি। কিন্তু স্কুল ভবনের স্থাপত্যশৈলীকে সম্প্রতি একেবারে ভিন্ন ধারায় নিয়ে গিয়েছেন বাংলাদেশের কয়েকজন স্থপতি। বাংলাদেশে ভিন্নধর্মী স্কুল ভবন গুলোর কথা বলতেই আমাদের এই ব্লগ। 

দীপশিখা মেটি স্কুল

স্কুল
দীপশিখা স্কুলের স্থপতি আন্না হেরিঙ্গার এই নান্দনিক শিল্পের জন্য আগা খান আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মোঙ্গলপুর ইউনিয়নের রুদ্রপুর গ্রামটি বড় সাধারণ। তবে এখানে অবস্থিত ‘দীপশিখা মেটি স্কুল’ হয়ে উঠেছে ভীষণ অন্যরকম ও অসাধারণ। কেননা বাংলাদেশে ভিন্নধর্মী স্কুল ভবনের যাত্রা শুরু এর মাধ্যমেই। এ স্কুলের পুরোটা মাটি ও বাঁশের তৈরি। ভিন্নধর্মী নির্মাণশৈলীর কারণে দীপশিখা মেটি স্কুলের নাম ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। দীপশিখা স্কুলের স্থপতি আন্না হেরিঙ্গার এই নান্দনিক শিল্পের জন্য আগা খান আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। 

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দীপশিখা নন-ফরমাল এডুকেশন, ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ সোসাইটি ফর ভিলেজ ডেভেলপমেন্টের উদ্যোগে স্কুলটি পরিচালিত হয়। দোতালা এ স্কুলে, কক্ষে শিক্ষার্থীরা গরম-শীতের অনুভূতি তীব্রভাবে অনুভব করে না কেননা মাটি, খড় মেশানো কাদায় তৈরি এর দেয়াল। দেয়ালের ভিতের ওপর দেয়া হয়েছে আর্দ্রতারোধক উপাদান। মেঝের প্লাস্টারে পামওয়েল ও সাবানের পেস্ট ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণভাবে ওয়াটারপ্রুফ। স্কুলটি উচ্চতায় ৯ ফুট। ছাদ হিসেবে বাঁশ বিছিয়ে ও বাঁশের চাটাই দিয়ে মাটির আবরণ দেয়া হয়েছে। ওপরে বৃষ্টির পানির জন্য দেয়া হয়েছে টিন। মেটি স্কুলের কক্ষসংখ্যা ৬। এর আয়তন ৮ হাজার বর্গফুট। ভবনটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৭ লাখ টাকা।

প্রথমে ১৯৯৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর রুদ্রাপুর গ্রামের ছোট্ট পরিসরে ‘মেটি স্কুল’ গড়ে তোলা হয়েছিলো। পরবর্তীতে আলোচিত এই স্থাপনাটির নির্মাণ শুরু হয় ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে। স্কুল ভবনের পেছন দিকে ‘আনন্দালয়’ নামের কমিউনিটি থেরাপি কেন্দ্র। রাস্তার দু’ধারে লম্বা লম্বা সুপারির গাছ। ছায়াঘেরা সে পথ পেরিয়ে তারপর পাবেন মাটির তৈরি দুটো ভবন। নিচতলা পুরোপুরি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ব্যবহৃত হয়। ঘরের ভেতর মাটির তৈরি গুহায় খেলাধুলা করে শিশুর দল। গুহার ভেতর চলাফেরার জন্য প্রতিবন্ধীদের এক ধরনের ব্যায়াম হয়ে যায়, এটি তাদের চিকিৎসা বা ফিজিওথেরাপিরি একটি অংশ। দীপশিখা মেটি স্কুলের ভিন্নধর্মী স্থাপত্য আর নান্দনিকতা মুগ্ধ করে সকলকেই। 

শাহাবুদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ

স্কুল
ভীষণ অন্যরকম ও মনকাড়া এই স্কুল ক্যাম্পাস

চাঁদপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মিত এ স্কুলটির লক্ষ্য অসচ্ছল পরিবারের শিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা। দেশীয় প্রযুক্তি দিয়ে নির্মিত শাহাবুদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশে ভিন্নধর্মী স্কুল ভবন এর তালিকায়। 

এর স্থাপনাশৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেখতে কিছুটা ইউরোপিয়ান স্টাইলে তৈরিকৃত ভবন এটি। দোতলা স্কুল ভবনে ছাদের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে কারুকাজে সজ্জিত সিমেন্ট শীট দিয়ে তৈরি ছাউনি। প্রশস্ত বারান্দা এর আরেকটি প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য। শ্রেণিকক্ষগলোতে প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠদান করা হয়। 

বারান্দা ও শ্রেণিকক্ষ গুলোর আশপাশে এনার্জি বাল্ব লাগানো রয়েছে, যা বাঁশের তৈরি থলিতে সুনিপুণভাবে মোড়ানো। ফলে তৈরি হয় ভিন্ন আবহ। ভবনটির সামনেই রয়েছে খোলা মাঠ। স্কুল মাঠের পূর্বে গ্রামের রাস্তা আর উত্তর প্রান্তে সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে রয়েছে একটি শহীদ মিনার। সব মিলিয়ে ভীষণ অন্যরকম ও মনকাড়া এই স্কুল ক্যাম্পাস।

ভাসমান স্কুল 

নৌকা
এই প্রকল্পকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে দুটি তথ্যচিত্র

১৯৯৮ সালে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার সিধুলাই গ্রামের তরুণ স্থপতি মোহাম্মদ রেজওয়ানের উদ্যোগে ‘সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা’ নামে একটি অলাভজনক সংস্থা গড়ে তোলা হয়৷ এই ছিলো গ্রামটি বন্যাকবলিত এবং বড় জলাধারবেষ্টিত। তাই রেজওয়ানের লক্ষ্য ছিলো সংস্থাটির মাধ্যমে এ জলাধারকেই তাঁর গ্রামের উন্নয়নে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা। সে ভাবনা থেকেই ‘নৌকায় স্কুল’ এর নকশা করেছিলেন তিনি৷ সে অনুযায়ীই নির্মিত হয় ‘ভাসমান স্কুল’।

২০০২ সালে এই স্কুল পুরোপুরি যাত্রা শুরু করে৷ প্রথমে তাঁর সম্বল ছিল স্কলারশিপে পাওয়া মাত্র ৫০০ মার্কিন ডলার৷ তবে এক বছর পর তিনি আরো ৫,০০০ মার্কিন ডলার অনুদান পান৷ তারপর ক্রমেই সফলতার পথে এগিয়ে গিয়েছে ভাসমান স্কুলের প্রজেক্টটি। 

সাধারণ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের মতো করেই সাজানো নৌকার ভেতরে শ্রেণিকক্ষ, পাঠাগার ৷ বরং এ নৌকা স্কুল সেখানকার ভূমিতে স্থাপন করা অন্যান্য স্কুলের চেয়ে আরও বেশি আধুনিক৷ এ স্কুলে আছে কম্পিউটারসহ শিক্ষায় ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক অনেক ডিভাইস৷ স্কুলের ছাদে বিদ্যুত সংযোগের জন্য আছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল৷ এই বিদ্যুতে সন্ধ্যার পরও স্কুলের কার্যক্রম চালানো যায়, গ্রামে ভেতরও আলোর ব্যবস্থা করা যায়। 

বর্তমানে ভাসমান স্কুল রয়েছে ২২টি আর এতে ১,৮১০ জন শিশু পড়াশুনা করছে৷ নৌকা স্কুলগুলোর প্রতিটিতে একবারে ৩০ জন শিশু পাঠ নিতে পারেন ৷ শিশুদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের জন্যও রয়েছে কম্পিউটার শেখার সুযোগ। 

নৌকায় স্কুলের নকশার জন্য ১৪টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে পেয়েছেন সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক স্থপতি মোহাম্মদ রেজওয়ান৷ তাঁর প্রকল্পকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে দুটি তথ্যচিত্র৷ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে থাকা বিভিন্ন দেশ যেমন কম্বোডিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন্স, ভিয়েতনমি ও জাম্বিয়ায় চালু হয়েছে তাঁর নকশায় বানানো ভাসমান স্কুল।

বাংলাদেশে ভিন্নধর্মী স্কুল ভবন এর এই তালিকা আমাদের যেন জানাচ্ছে এক নতুন সম্ভাবনার কথা। নতুন দিনের স্থাপত্যশৈলীর এ দারুণ নিদর্শনগুলো নিঃসন্দেহে আমাদের গর্ব। কেমন লাগলো অবাক করা স্কুলঘর নিয়ে আমাদের এ আয়োজন, তা জানাতে লিখতে পারেন আমাদের কমেন্ট বক্সে। 

Write A Comment