Reading Time: 4 minutes

বাড়ি বানানো যেকোনো  মানুষের জন্যই একটি স্বপ্নের শামিল। নিরলস পরিশ্রমের বিনিময়ে উপার্জিত অর্থ, আমরা অনেকেই একটু একটু করে সঞ্চয় করি নিজের একটি বাড়ি বানানোর প্রত্যাশায়। অন্যদিকে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ে  যারা সম্পৃক্ত তারাও মোটা অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেন ভবন নির্মাণে। তাই নিজের থাকার জন্য হোক বা বিক্রির জন্য, বাড়ি নির্মাণে প্রত্যেককেই থাকা উচিৎ সচেতন, এবং খতিয়ে দেখা উচিৎ এর জরুরি বিষয়গুলো। ঠিক এখানেই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা। যা অনুসরণ না করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া যাবে না। তাই, জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরছি আজকের লেখায়।  

জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা কী?

একটি ভবন নির্মাণের সময় নূন্যতম যে পরিমাণ মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে সে সম্পর্কে সরকার কর্তৃক যে বিস্তারিত নির্দেশনা থাকে সেটিই হচ্ছে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড বা জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা। যেকোনো ভবন নির্মাতা, কোন স্থাপনা নির্মাণের আগে অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এই জাতীয় নির্মাণ বিধিমালা মেনে, ছাড়পত্র গ্রহণ করে ভবন নির্মাণের অনুমতি পায়। এই বিধিমালা রাখার উদ্দেশ্যই হল ভবনে বসবাসরত সকলের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  পৃথিবীর সকল উন্নত দেশেরই এমন নিজস্ব একটি ভবন নির্মাণ বিধিমালা বা বিল্ডিং কোড রয়েছে। বাংলাদেশেও ফ্লোর এরিয়া রেশিও, ম্যাক্সিমাম গ্রাউন্ড কাভারেজ, সেটব্যাক রুল, ভবনের পার্শ্ববর্তী রাস্তার দূরত্ব, বৈদ্যুতিক লাইনের অবস্থান, ভূমি ব্যবহার  ইত্যাদি বিষয়গুলোতে কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। 

ফ্লোর এরিয়া রেশিও(এফএআর এবং এমজিসি) 

Building sample picture
ফ্লোর এরিয়া রেশিও অনুযায়ী নির্ধারিত জায়গা ছেড়ে ভবনের উচ্চতা বাড়ানো যাবে

এফএআর মানে হল, মোট জমির ক্ষেত্রফল অনুপাতে ভবন নির্মাণযোগ্য সম্পূর্ণ ফ্লোরের যোগফল। কতটুকু জায়গা ছেড়ে কততলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাওয়া যাবে তা এফএআর এর হিসাব থেকেই নির্ধারিত হয়। এ ফ্লোর এরিয়া রেশিও অনুযায়ী আপনি নির্ধারিত জায়গা ছেড়ে দিয়েই কেবলমাত্র ভবনের উচ্চতা উপরের দিকে বাড়াতে পারবেন। 

ম্যাক্সিমাম গ্রাউন্ড কভারেজ(এমজিসি)

এফএআর এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ম্যাক্সিমাম গ্রাউন্ড কভারেজ(এমজিসি)। ভবন নির্মাণ বিধিমালাতে এমজিসির একটি নির্ধারিত চার্ট রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে জমির আকারভেদে কী পরিমাণ জায়গা ছেড়ে ভবন নির্মাণ করা যাবে। সুতরাং অনুমোদন পেতে শুরুতেই ভবন নির্মাতাকে এফএআর এবং এমজিসির মতো আইনী বিষয়গুলো মেনে বাড়ি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 

সেট ব্যাক রুল

ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান(ড্যাপ) অনুযায়ী শহরের সবুজায়ন, আলো বাতাস চলাচল, বৃষ্টির পানি শোষণ ইত্যাদি নিশ্চিত করতে রাজউক কিছু সেট ব্যাক রুল দিয়ে দিয়েছে।  ভবনের সামনে, পিছনে, এবং ভবনের দুইপাশে নূন্যতম কতটুকু  জায়গা ছাড়তে হবে তা সেট ব্যাক রুলে নির্ধারণ করা থাকে। সুতরাং কেবল এফএআর এবং এমজিসি মেনে জায়গা ছাড়াই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি ভবনের কোন পাশে কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে, তার জন্য আপনাকে অনুসরণ করতে হবে সেট ব্যাক রুল।

পার্শ্ববর্তী রাস্তা ও দূরত্ব 

ভবন নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী ভবনের পার্শ্ববর্তী রাস্তাগুলোর প্রশস্ততার উপরেও নির্ভর করছে ভবন নির্মাণের অনুমোদন। ভবন সংলগ্ন রাস্তা কমপক্ষে ৩.৬৫ মিটার প্রশস্ত হতে হবে এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন রাস্তার ক্ষেত্রে এ প্রশস্ততা হতে হবে কমপক্ষে তিন মিটার।  যদি কোনো পাশে লম্বাভাবে রাস্তা শেষ হয় সেক্ষেত্রে এর প্রস্থ, পাশের রাস্তার প্রস্থ বলে বিবেচিত হবে। বিধিমালায় আরো বলা হয়েছে মালিকানায় উল্লেখ নেই এমন রাস্তা সর্বসাধারণের রাস্তা বলে বিবেচিত হবে। ভবনটি দুই রাস্তার সংযোগ স্থলে অবস্থিত হলে, এর কোণে এক মিটার জায়গা রাস্তা সরলীকরণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। এছাড়া, ভবনের কাছের যেকোনো  রাস্তার কেন্দ্র থেকে কমপক্ষে সাড়ে চার মিটার দূরে ভবনটি নির্মাণ করতে হবে। 

ভূমি ব্যবহারের নীতিমালা

যেকোনো  ভবন নির্মাণ পরিকল্পনাই সরকার অনুমোদিত সংশ্লিষ্ট শহর বা মহানগরীর মহাপরিকল্পনায় নির্দেশিত ভূমি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। এজন্যই জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ভূমি ব্যবহারের নীতিমালা। নীতিমালা অনুযায়ী, আবাসিক বা অন্যান্য ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থানে আবাসিক ছাড়াও সর্বোচ্চ ১০ শয্যাবিশিষ্ট ক্লিনিক, ব্যাংক, ফাস্টফুড রেস্টুরেন্ট, মুদি দোকান, সেলুন, ফার্মেসি ইত্যাদির জন্য ভবন নির্মাণ করা যাবে। তবে এ রকম ইমারত কেবল দুটি রাস্তার সংযোগস্থলে নির্মাণ করা যাবে। এক্ষেত্রে ভবনের পাশের একটি রাস্তা কমপক্ষে ছয় মিটার প্রশস্ত হতে হবে। ভবন নির্মাতা চাইলে আবাসিক এলাকাতেও বাণিজ্যিক ভবন, অথবা আবাসিক ও বাণিজ্যিক দুই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যাবে এমন ভবন নির্মাণ করতে পারেন। তবে এজন্য নির্ধারিত বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে। যেমন, এরকম ভবনে গাড়ি পার্কিং, মালামাল রাখার গুদাম রাখতে হবে এবং সামনের রাস্তা কমপক্ষে ২৩ মিটার প্রশস্ত হতে হবে।

সীমানা দেয়াল

বিল্ডিং এর পাশের সীমানা দেয়ালের উচ্চতা হতে হবে ১.৭৫ মিটার বা তার কম। ২.৭৫ মিটার উচ্চতার দেয়াল করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে উপরের এক মিটার গ্রিল বা জালি হতে হবে।

গাড়ি পার্কিং

ঢাকা অথবা চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২৩ বর্গমিটার জায়গা গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য রাখতে হবে।  এছাড়াও, বাণিজ্যিক এলাকা হলে সরকারি কর্তৃপক্ষের নির্ধারণ করে দেওয়া জায়গা গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য রাখতে হবে।

বৈদ্যুতিক লাইন থেকে ইমারতের দূরত্ব

Wires and poles
খোলা বৈদ্যুতিক লাইন থেকে নিরাপদ দূরত্বে ভবন নির্মাণ করতে হবে

যেকোনো  ভবন খোলা বৈদ্যুতিক লাইন থেকে নিরাপদ দূরত্বে নির্মাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড অথবা ঢাকা বিদ্যুৎ সরবরাহ কর্তৃপক্ষের নিয়ম মানতে হবে।

আলো-বাতাস চলাচল

ভবনের প্রত্যেকটি রুমে দরজা, জানালা, ফ্যান, লাইট ইত্যাদির মাধ্যমে স্বাভাবিক আলো-বাতাস চলাচলের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। রান্নাঘরের অবস্থান ভবনের এক পাশে, অর্থাৎ বাইরের দেয়ালের সাথে হতে হবে।

জরুরি নির্গমন পথ 

Cements and mortars
ভূমি ব্যবহারের নীতিমালা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করতে হবে

ফ্লোরের যেকোনো জায়গা থেকে ২৫ মিটারের মধ্যে জরুরি নির্গমন পথ থাকতে হবে। এক্ষেত্রে ১টি নির্গমন পথ দিয়ে সকল জায়গা আচ্ছাদিত না হলে, ২টি বা তার বেশি ফায়ার এক্সিট রাখতে হবে। এছাড়াও, ফায়ার সেফটি হিসেবে ভবনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। জরুরি সময়ে যাতে সবাই ভবন থেকে বের হয়ে যেতে পারে, এজন্য নির্দেশিত ফায়ার অ্যালার্মও রাখতে হবে। এছাড়াও, ভবন নির্মাণের সময় বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা রাখতে হবে। রাখতে হবে আবর্জনা অপসারণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থাও। এ সংক্রান্ত আরও জানতে পড়তে পারেন বাংলাদেশের জাতীয় নির্মাণ বিধিমালা সম্পর্কে বিস্তারিত। 

জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা না মেনে ভবন নির্মাণ করলে সরকারের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ যেকোনো  সময় ভবন ভাঙ্গার বা অপসারণের নির্দেশ দিতে পারে। তাই ভবন ও ভবনের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই নিয়মগুলো প্রত্যেক ভবন নির্মাতার মেনে চলতে হবে। আজকের ব্লগটি আপনার বাড়ি নির্মাণের সিদ্ধান্তে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পেরেছে? কমেন্টে জানিয়ে দিন।

Write A Comment

Author