Reading Time: 5 minutes

শুরু হয়ে গেলো পবিত্র মাহে রমজান। আমরা অনেকেই ইতিমধ্যে নিয়েছি রমজানের প্রস্তুতি। কিন্তু এবারের রমজান বেশ অন্যরকম। রোজা রাখার জন্য শরীরকে সুস্থ রাখার এমনিতেও কোন বিকল্প নেই। কিন্তু, এবারের সাবধানতা একটু বেশি ই। এই রোজার মাসে দৈনন্দিন রুটিনে আসে বিশাল পরিবর্তন। রমজানে রোজা ভালোভাবে পালনের জন্য শারীরিক সুস্থতা খুবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু, গ্রীষ্মের এই সময়ে দিন বড় হওয়াতে দীর্ঘক্ষণ রাখতে হচ্ছে রোজা। তাই দিনের অনেকটা সময় আমাদের না খেয়ে কাটাতে হয়। এই না খেয়ে কাটানো সময়ে শরীর তার সংরক্ষণকৃত কার্বোহাইড্রেট এবং ফ্যাট থেকে এনার্জি নিয়ে কাজ সঞ্চালন করে থাকে। এক্ষেত্রে শক্তি সঞ্চালনের জন্য সঠিক খাদ্যভাসের পাশাপাশি আরও আনুষাঙ্গিক কিছু বিষয় মেনে চলা অত্যন্ত জরুরী। তাই জেনে রাখা দরকার রমজান মাসে সুস্থ থাকার কিছু টিপস।

যা যা খাওয়া উচিত

ইফতার
রমজান মাসে সুস্থ্য থাকতে গড়ে তুলুন স্বাস্থ্যকর খাদ্যভাস

ইফাতার এবং সেহরিতে সবরকম খাদ্য উপাদান রাখা জরুরী। তবেই সাচ্ছন্দ্যে রোজা পালন সম্ভব। প্রায়ই আমরা ইফতারের পর যেকোনো খাবারে না ভেবেই ঝাঁপিয়ে পড়ি। খেয়ে ফেলি এমন অনেক খাবার যা আমাদের শরীরকে করে তোলে দুর্বল। ইফতারের পরে এবং সেহরির আগে আমরা অনেক ভাজাপোড়া, চর্বিযুক্ত এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার খেয়ে ফেলি। প্রচুর পরিমাণে খাবার এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার শরীরে কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড এবং পেটে গ্যাস্ট্রোনমিক্যালের মাত্রা বৃদ্ধি করে থাকে। যার ফলে রোজার দিন গুলো হয়ে উঠে বিষাদময়। সঠিক খাদ্যভাসের মাধ্যমে পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যকরভাবে  থেকে রোজা পালন করা সম্ভব। এই রমজান মাসে সুস্থ থাকার কিছু টিপস আপনাকে দিতে পারে বাড়তি সতর্কতা। আসুন জেনে নেই এই রমজান মাসে কী কী খাদ্য খাবো এবং কী খাদ্য আমরা এড়িয়ে যাবো।

সেহরি

দিন এখন অনেক বড় হয়েছে তাই দীর্ঘক্ষণ রাখতে হচ্ছে রোজা। আর দিনের শুরু হয় সেহরি দিয়ে। সেহরির খাদ্য তালিকায় রাখা উচিৎ প্রোটিন সমৃদ্ধ, আঁশযুক্ত, সুষম, দ্রুত হজম হয়ে যায় এমন খাবার । সেই সাথে যথেষ্ট পরিমাণে পানি খাওয়া, যাতে করে সারা দিন আপনি হাইড্রেটেড থাকতে পারেন। ভাবছেন আঁশযুক্ত খাবার কোন গুলো? আঁশযুক্ত খাবার হলো গম বা গম থেকে তৈরি খাবার যেমন ধরুন, রুটি, শাকসবজি, ফল, বাদাম ইত্যাদি। আপনি চাইলে সুষম খাবারও রাখতে পারেন। যেমন ফলমূল, শাকসবজি, কম চর্বিযুক্ত মাংস বা মাছ, ভাত বা রুটি, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডিম ইত্যাদি।

সেহরিতে যে খাদ্য এড়িয়ে চলা উচিৎ

সেহরিতে ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার, মাত্রাতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ ও অতিরিক্ত চা বা কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। অনেকেই আছেন যারা সারাদিন রোজা রেখে ধূমপান থেকে বিরত থাকছেন যার ফলে ইফতারের পর সেহরি অব্দি অতিরিক্ত ধূমপান করে থাকেন। এই রকম ধূমপানের প্রবণতা রোজা আসার ১০ থেকে ১৫ দিন আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করুন। রোজার সময় ধূমপান থেকে বিরত থাকুন।

ইফতারে কী খাওয়া উচিৎ

দিনভর রোজা রাখার পর ইফতারি হিসেবে বেছে নিতে পারেন মৌসুমি ফলের শরবত। খেজুর খাওয়া উচিৎ, দু-তিনটির বেশি খাওয়া ঠিক নয়। কারণ এতে সুক্রোজের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। কাঁচা ছোলা ভিটামিন সি এর খুব ভালো উৎস। প্রতিদিনের ইফতারে কাঁচা ছোলা নিশ্চিত করুন। আপনি  চাইলে টাটকা সবজি দিয়ে তৈরি এক বাটি স্যুপ দিয়ে ইফতার সেরে ফেলতে পারেন। স্যুপ একদিকে যেমন পানির অভাব পূরণ করবে তেমনি এটি পাকস্থলীর জন্য উপকারী হবে। ইফতারের সাথে আপনি আরও বেছে নিতে পারেন সালাদ। রোজার মাসে ভাজাপোড়া এতটাই খাওয়া হয় যে শাকসবজি তেমন করে খাওয়া হয়না। তাই ইফতারে  বেশি করে সালাদ খেয়ে সেই চাহিদা পূরণ করতে পারেন। সবচেয়ে জরুরী যে খাদ্য উপাদান তা হচ্ছে পানি। খাবারের সমাহারে সবচেয়ে প্রথমে যা মনে আসবে তা হচ্ছে পানি। পানির কোন বিকল্প নেই, তাই যতটুক সম্ভব পানি পান করুন। এই গরম আবহাওয়ায় খেজুর, পানি, স্যুপ ও সালাদ দিয়ে করতে পারেন এবারের ইফতার।

ইফতারে কী কী খাদ্য এড়িয়ে চলা উচিৎ

ইফাতারে ভাজাপোড়া একদম এড়িয়ে চলুন। যদিও ইফতারে ভাজাপোড়া না খেলে আমাদের চলেই না তবুও এটিকে পরিহার করুন। এই ভাজাপোড়ার ফলে আমাদের শরীরে চর্বির মাত্রা বৃদ্ধি হয়। এছাড়া গ্যাস্ট্রোনোমিকাল সমস্যাগুলি বৃদ্ধি পায় এবং ক্লান্তি ও অসুস্থতা সৃষ্টি হয়। কফি, সোডা কিংবা চা একেবারেই এড়িয়ে চলুন কেননা ক্যাফিন আপনার শরীরে তরল, লবণ এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে না বরং অনিদ্রা এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করে। প্রক্রিয়াজাত কার্বনেটেড পানীয় গুলো অবশ্যই এড়িয়ে যাওয়া উচিৎ কেননা, এতে ক্যালোরির মাত্রা থাকে অনেক, যা শরীরের জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকর। অত্যধিক মিষ্টি জাতীয় খাবারও এড়িয়ে চলা উচিৎ। এই সমস্ত খাদ্য শরীরে অতিরিক্ত মেদ এবং শারীরিক জটিলতাও সৃষ্টি করে তাই এসব খাদ্য বর্জন করাই শ্রেয়। আর যাদের ডায়েবেটিকস রয়েছে তারা মিষ্টি জাতীয় খাবার নিয়ে খুবই সতর্ক থাকবেন। হুটহাট ঠান্ডা পানি দিয়ে ইফতার করবেন না। বেশি ঠাণ্ডা পানি রক্তনালি সংকোচন বাড়িয়ে হজমে সমস্যা করে। তাই এসময় স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি পান করুন।

যে সমস্ত বিষয়ে নিতে হবে সাবধানতা

মানুষ হাত ধুচ্ছে
স্বাস্থ্যবিধি মেনে হোক সিয়াম সাধনা

স্বাভাবিক সময় থেকে বেশ অন্যরকমভাবেই পালিত হচ্ছে এবারের রমজান। নানা বিধি নিষেধ আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে করতে হচ্ছে রোজা। আমাদের ভাবতে হবে কোভিডকে মাথায় রেখে কীভাবে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে রোজা পালন করা সম্ভব। রমজানে খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া চাই তা উপরেই বলা রয়েছে এবারে তাহলে খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি আর কী কী বিষয়ে নিতে হবে সাবধানতা সে সম্বন্ধে জানা যাক।

স্বাস্থ্যকর ঘর

আমাদের ঘরের এমন কিছু জিনিস বা জায়গা আছে যেগুলো, সারাদিনে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সেগুলোর প্রতি আপনাকে মনোযোগী হতে হবে। যেমন, টেবিল, ডাইনিং চেয়ার, ইলেকট্রিক সুইচ, টয়লেট, ডোর নবস, হ্যান্ডেল এবং রিমোট। সারা দিনে এই জিনিসগুলো ঘরের সবাই বার বার স্পর্শ করে থাকে। যার ফলে ঘরের এই সমস্ত জিনিসে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা বেশি  থাকে। এইজন্য এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত। খুবই ভালো ফলাফল হয় যদি দিনে দু-একবার এগুলো পরিষ্কার করা যেত। এগুলো পরিষ্কার করার জন্য যেকোন দোকান থেকে অ্যালকোহল বেইসড লিকুইড ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করে জীবাণু মুক্ত করতে পারেন।

জায়নামাজ পরিষ্কার করা

রোজার মাসে আমরা সবাই রোজা রাখার পাশাপাশি ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে থাকি। জায়নামাজে আমরা নামাজ পরি ও নামায শেষে কিছু সময় অতিবাহিত করে থাকি। যেহেতু যায়যামাজে আমরা সিজদাহ করি এবং হাটু গেড়ে বসি তাই এটা পরিষ্কার রাখা ও নিয়মিত ধোঁয়া অত্যন্ত জরুরী। নয়তো বা নানারকম জীবাণু এসে এখানে বাসা বাঁধতে পারে।

জনসমাগম এড়িয়ে চলা

সরকার থেকে যেকোন জনসমাগম করতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাই এবারের তারাবি বা ঈদের নামাজ ঘরে বসেই আদায় করে নিন। লোকালয় এড়িয়ে যাওয়াই এই সময়ে সবচেয়ে জরুরী।

ঘুমানোর সময় ঠিক রাখা

অনেকেই আছেন সেহরি পর্যন্ত জেগে থাকেন। এতে করে শরীরের ক্ষতি যেমন হয় তেমনি রোজা পালন করতেও দেখা যায় নানা রকম সমস্যা। রোজার মাসে তাই আমাদের উচিত সঠিক সময়ে ঘুমানো এবং বিশ্রাম করা। শরীরের জন্য ঘুম প্রয়োজন ৬ থেকে ৭ ঘন্টা। এর কম পরিমাণ ঘুম শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

ঠাণ্ডা পানি এড়িয়ে চলা

যতটা সম্ভব ঠান্ডা পানি এড়িয়ে চলুন। স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি পান ও ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ। এই করোনা কালে আপনাকে খেয়াল করতে হবে যেন কোনভাবেই আপনার ঠাণ্ডা বা সর্দি বা জ্বর যেন না হয়। এই সবই এখন কোভিডের লক্ষণ তাই নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে আপনাকে অবশ্যই ঠান্ডা পানি এড়িয়ে যেতে হবে।

বলে রাখা ভালো, প্রত্যেক মানুষের স্বাস্থ্যের অবস্থা আলাদা। তাই কোন ধরনের অসুস্থতা থাকলে রোজা রাখার ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। আশা রাখি এই সকল রমজান মাসে সুস্থ থাকার কিছু টিপস গুলো আপনাকে সহায়তা করবে। এবং আমি যদি কোন কিছু জানাতে ভুলে যাই কমেন্টে আমাকে জানাতে ভুলবেন না।

Write A Comment